eng
competition

Text Practice Mode

ব্ল্যাক বোর্ড থেকে ল্যাপটপ মনিটর

created Aug 23rd 2020, 19:24 by Shohel


6


Rating

890 words
10 completed
00:00
আমার শিক্ষকতা শুরু সাদাকালোর যুগে, ১৯৭৪ সালে। সে সময় পাসপোর্টের ছবি হতো সাদাকালো, বিয়ের ছবিও। কনের পরনে সাদাকালো বেনারসি শাড়ি, পাশে সাদাকালো আচকান পাগড়ি পরা বর। ভাবা যায়!
আমি ক্লাসে যেতাম চক আর ডাস্টার হাতে, ক্লাসে থাকত ব্ল্যাক বোর্ড। বোর্ডে চক দিয়ে লিখলে চুলে-জামায় চকের গুঁড়া পড়ত। যাঁরা বোর্ডে বেশি লিখতেন, তাঁরা ক্লাস শেষে বেরোতেন সাদা চুল নিয়ে। প্রতীকী অর্থে শিক্ষকদের এই দশা অবশ্য সব সময়ের। পড়াতে গিয়ে চুল সাদা হয়ে গেছে অনেকের। কাজটা কঠিন।
আমি বোর্ডে কমই লিখতাম-না, চকের গুঁড়ার উৎপাতের জন্য নয়, বরং প্রিয় শিক্ষক আহসানুল হক স্যারের একটা উপদেশের জন্য। শিক্ষকতার শুরুতেই স্যার বলেছিলেন, ‘শোনো, একজন শিক্ষকের কাজ শুধু সিলেবাস শেষ করা নয়, তাঁর কাজ পড়ানো।’ তিনি কখনো সিলেবাস শেষ করেছেন বলে মনে পড়ে না, কিন্তু পড়িয়েছেন-যে অর্থে সাহিত্য পড়া বইয়ের পাতা ছাড়িয়ে চিন্তার, অনুভবের গভীরে গিয়ে কিছু সত্য, কিছু গল্প তুলে আনা, যা জীবনটাকে নতুন করে দেখতে শেখায়।
আমি পড়াতাম, এখনো পড়াই-দাঁড়িয়ে। আর যাঁরা সামনে বসত, তাঁরাও ছিল সাদাকালো। অর্থাৎ তাদের কাপড়ে-পোশাকে ছিল সাদার আধিক্য, তাঁদের ভাবনাতেও। সময়টা ছিল অনেকটাই অজটিল। বইয়ের সাদাকালো পৃষ্ঠাগুলো তাদের আকর্ষণ করত, তারা পড়ত। তখনো সেমিস্টার পদ্ধতি নামের আমদানিটি, যা সাহিত্য পাঠকে খণ্ডে খণ্ডে সাজিয়ে এর আকার-প্রকার বদলে ফেলেছে, ছিল অশ্রুত বাদ্য। তখন শেক্‌সপিয়ার পড়া ছিল তাঁর বেশ কিছু নাটকের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা। অথচ এখন পড়ুয়ারা তাঁকে বোঝে একটা পা অথবা শুঁড় দিয়ে, চক্ষুহীনের হাতি দেখার মতো।
পাঁচ বছর বিদেশে থেকে যখন ফিরলাম, তখনো ক্লাস ছিল সাদাকালো। বেশ কিছুদিন পর এল হোয়াইট বোর্ড। সঙ্গে কালো লেখনি। এই লেখনির নাম মার্কার পেন। দাম ভালোই, চকের মতো মূল্যহীন নয়। ছেলেমেয়েরা তত দিনে সাদাকালোর শাসন থেকে বেরিয়ে রং পরতে শুরু করেছে। ছবিশিল্প পা দিয়েছে রঙিন জগতে, টেলিভিশন রঙিন, রাজ্জাক-ববিতার সিনেমা পুরো না হলেও ‘আংশিক রঙিন’। সাদা বোর্ডটা চকচক করত, বলত, ‘আমায় ব্যবহার করুন।’ আমিও মাঝেমধ্যে লিখতাম। ভালোই লাগত, অক্ষরগুলো জ্বলজ্বল করত, দূর থেকেও সেগুলো পড়া যেত। ব্ল্যাক বোর্ড সামনের বেঞ্চের ছেলেমেয়েদের অগ্রাধিকার দিত, যত পেছনে বসা, তত বোর্ডের লেখা অস্পষ্ট হওয়া। তবে ক্লাসগুলো ছোট হওয়ায় এই অস্পষ্টতা এর গুরুত্বকে খাটো করত না। আমরা যখন প্রথম বর্ষে পড়ি, সব মিলিয়ে ছিলাম জনা চল্লিশেক। এখন পড়ে এক পঁয়ষট্টি। এখন ক্লাস নেওয়া আর জনসভায় ভাষণ দেওয়ার মধ্যে পার্থক্য নেই।
 
একসময় লাল-নীল-সবুজ মার্কার পেন বাজারে এলে হোয়াইট বোর্ডে রঙের পরশ লাগল। কিন্তু কিং লিয়ার পড়াবার সময় রং দিয়ে লেখার কীই-বা থাকে, বলুন!
 
আশির দশকের শেষে ইংরেজি বিভাগের পাঠক্রমে কিছু পরিবর্তন এল। সংস্কৃতি পঠনের কিছু পাঠ তাতে যোগ হলো। একসময় দৃশ্য মাধ্যমের প্রাবল্য শুরু হলে এর বিস্তৃতি বাড়ল। পাঠক্রমে উত্তরাধুনিক সাহিত্য যোগ হলে সাদাকালোর গণ্ডিতে তাকে আর আবদ্ধ রাখা গেল না। ইংরেজি সাহিত্যের নদীতে রকম দু–এক খালের সংযোগ ঘটলে বিষয়বৈচিত্র্য বাড়ল বটে, কিন্তু খাল বেয়ে যে কুমীর এল, তার নাম দৃশ্যমান্যতা। এটি একটি নতুন সংকট তৈরি করল, তবে তা কিছুটা কাটানো গেল একটি শ্রেণিকক্ষে ডিজিটাল বোর্ড বসিয়ে। এটি কিনতে বেশ পয়সা গেল। যে কোম্পানি বোর্ডটি বসাল, তার লোকজন আমাদের শেখাল কীভাবে ছবি, ভিডিও-এসব দেখানো যায়। আমাদের মনে হলো, ব্যাপারটা খোলা মাঠে একটা চক্কর দেওয়ার মতো সোজা। কিন্তু ব্যবহার করতে শুরু করলে দেখা গেল, এর মেজাজ মাফিয়া বসদের মতো। আমাদের কোনো আদেশই সে শুনবে না। তার সঙ্গে যোগ হলো ডেসার অসহযোগ। কলা ভবনের বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিঝুম দ্বীপের পল্লী বিদ্যুৎ সঞ্চালনকেও লজ্জা দিত। ডিজিটাল বোর্ডটি একসময় সাদা হাতির মর্যাদায় অবসরে গেল।
এতে আমি অবশ্য তেমন আহত হইনি, শুধু ওই পয়সার অপচয় ছাড়া। এলিয়টের বিরানভূমির কবিতা পড়াতে ডিজিটাল বোর্ড আমাকে কী সাহায্য করবে, নিয়ে আমি ভেবেছি, মরুভূমি ইত্যাদির কিছু ছবি দেখানো ছাড়া। তবে আমি বুঝতে পারছিলাম চমকের ঢেউ সমাগত। সব লিখিত, মুদ্রিত সামগ্রীর ছবিতে রূপান্তরের দিন যে আসছে, তার চিহ্নগুলো স্পষ্ট হচ্ছিল। শিগগিরই শ্রেণিকক্ষে ইন্টারনেট সংযুক্ত কম্পিউটার পাওয়ার পয়েন্ট প্রক্ষেপক বসানো হল। একদিন টের পেলাম, ক্লাসে ‘লেকচার’ দেওয়ার দিন শেষ, এখন ক্লাসে গিয়ে যতটা শোনাতে হবে, তার সমান অথবা বেশি দেখাতে হবে।
 
অস্ত্রচিকিৎসা করি অথচ লেজার সার্জারি কী, ঠিক জানি না-এটি যেমন বিড়ম্বনার, দীর্ঘদিন পড়িয়ে পাওয়ার পয়েন্ট কী জিনিস, তা না জানাটা প্রায় সে রকমই। কিন্তু আমি কীভাবে জানি শিখে নিলাম। এতে লাভ যে মন্দ হয়নি, তা বড় গলাতেই স্বীকার করি। কিন্তু ক্যামু অথবা কাফকা, ইয়েটস অথবা এলিয়ট-এঁদের কোনো লেখা পড়াতে গেলে পাওয়ার পয়েন্টের এস্তেমাল করতে ইচ্ছে হয় না। এখনো এদের সাদাকালোর জাদুর কাছে রং-ছবির মোহ মার খায়।
চক-ডাস্টারের যুগ থেকে পাওয়ার পয়েন্টের যুগে এসেও মোটামুটি চলছিল। এর মাঝে এল নয়া করোনা জীবাণুর আক্রমণ। এমনই তীব্রতা নিয়ে এই মহামারি আছড়ে পড়ল যে অর্থনীতি থেকে নিয়ে চিত্তবিনোদন, শিক্ষা থেকে নিয়ে সংসারযাপন-সব আমূল পাল্টে গেল। কিছুদিন শিক্ষাঙ্গন স্থবির থাকল। তারপর একটা শোরোগোল উঠল-মুখোমুখি শিক্ষা যখন অসম্ভব, অনলাইন শিক্ষা নিয়ে কেন ভাবা হবে না? ভাবাটা জোরেশোরেই হলো। ঘরে বসে তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে অলীক শ্রেণিকক্ষে ছায়াসর্বস্ব শিক্ষার্থীদের জড়ো করে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হলো। আমাকেও স্বীকার করতে হলো, এটি এখন নির্বিকল্প। আমি বিপন্ন বোধ করলাম। কিছুটা জেদ যে চাপল না, তা নয়, কারণ, হাল ছেড়ে দেওয়াটা কোনো কাজের কথা নয়। কিছুদিন প্রশিক্ষণ নিলাম। কারা ছিলেন আমার শিক্ষক? আরিফা রহমান আর তৌহিদুল ইসলাম খান, যাদের আমি একসময় পড়িয়েছি, এখন তারাও পড়ায় এক বিশ্ববিদ্যালয়ে। দুই মেধাবী মিলে আমাকে মোটামুটি অনলাইনসক্ষম করে তুলল। একদিন তৌহিদ আমাকে বলল, স্যার আপনি পারবেন।
 
তৌহিদ থেকে বরাভয় পেয়ে আমি এখন অনলাইনে পড়াই। ল্যাপটপ খুলে পর্দায় শিক্ষার্থীদের ভেসে বেড়ানো বুড়ো আঙুল সমান ছবি বা ছবির অভাবে অক্ষরের প্রদর্শনীর দিকে চোখ রেখে। পুরো একটি জীবন্ত ক্লাস স্থান করে নিয়েছে চৌদ্দ গুণিতক আট ইঞ্চির ভার্চ্যুয়াল পরিসরে। কাকে পড়াচ্ছি? বলা মুশকিল। প্রশ্নটা যাতে ‘কী যে পড়াচ্ছি’ পর্যন্ত না যায়, সেই চেষ্টা করে যাচ্ছি।
 
কবে মহামারি শেষ হবে, আর জীবনের দৃশ্য-গতি-কোলাহলে ভরা শ্রেণিকক্ষে ফিরে যাব, জানি না। সেই শ্রেণিকক্ষে একটি ব্ল্যাক বোর্ডও যদি থাকে, তাহলে হাতে একটা চকখণ্ড নিয়ে ছাত্রছাত্রীর সামনে দাঁড়াতে পারলেই আমার চলবে।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, লেখক: শিক্ষাবিদ কথাসাহিত্যিক, প্রথমআলো।

saving score / loading statistics ...